কবি হাবিবুর রহমান

হাবীবুর রহমান, (১৯২৩-১৯৭৬) কবি, সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক। ১৯২৩ সালের ১ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট থানার পালিশ গ্রামে তাঁর জন্ম। তিনি কলকাতার হেয়ার স্কুল থেকে প্রবেশিকা (১৯৪০) পাস করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন, কিন্তু আর্থিক কারণে তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।
হাবীবুর রহমান ১৯৪৩ সালে আসানসোলের কয়লা খনিতে শ্রমিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে কলকাতার মডেল হাই স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করার পর ১৯৪৭ সালে তিনি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় যোগদান করেন। এ বছর দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে তিনি ঢাকায় এসে পত্রিকার সহসম্পাদক হন। পরে দৈনিক সংবাদ (১৯৫১), সাপ্তাহিক কাফেলা, মাসিক সওগাত, মহিলা সাপ্তাহিক বেগম ইত্যাদি পত্রিকায় তিনি কাজ করেন।
পত্রিকা সম্পাদনা ব্যতীত হাবীবুর রহমান দেশি-বিদেশী অনেক সংস্থায় বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মার্কিন প্রকাশন সংস্থা ‘সিলভার বার্ডেট কোম্পানি’ (১৯৫৫-৫৬), ইউসিস (১৯৫৯-১৯৭২) ও ‘ফ্রাঙ্কলিন বুক প্রোগ্রামস’-এর বাংলা অনুবাদ-সম্পাদক (১৯৭৩-৭৪) এবং জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক (১৯৭৪-১৯৭৬) পদে কাজ করেন। দৈনিক সংবাদ-এর ছোটদের সাহিত্য-পাতা ‘খেলাঘর’-এর তিনিই প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন। তিনি ‘বাগবান’ নামে দৈনিক আজাদ-এর ‘মুকুলের মাহফিল’ পরিচালনা করেন।
লেখক হিসেবেও হাবীবুর রহমানের যথেষ্ট পরিচিতি আছে। তিনি তিনটি কিশোর উপন্যাস, পাঁচটি রূপকথা, একটি ছড়াগ্রন্থ এবং তিনটি জীবনী গ্রন্থ রচনা করেন। এছাড়া তাঁর কাব্য, নাটক, বিজ্ঞানবিষয়ক রচনা, অনুবাদ ও রূপান্তর এবং সমাজবিজ্ঞান বিষয়ক রচনাও রয়েছে। আগডুম বাগডুম, লেজ দিয়ে যায় চেনা, বনে বাদাড়ে, পুতুলের মিউজিয়াম, সপ্তডিঙা, চীনা প্রেমের গল্প ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। ১৯৭৬ সালের ১৭ জুন ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়। [মাহবুবুল হক]

সত্যেন সেন

সত্যেন সেন, (১৯০৭-১৯৮১) সাহিত্যিক, সাংবাদিক, রাজনীতিক। ১৯০৭ সালের ২৮ মে মুন্সিগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ি উপজেলার সোনারঙ গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতৃব্য ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতপূর্ব আচার্য।
সত্যেন সেন সোনারঙ হাইস্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস (১৯২৪) করে কলকাতা যান এবং সেখানকার একটি কলেজ থেকে এফ.এ ও বি.এ পাস করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ (ইতিহাস) শ্রেণীতে ভর্তি হন। কিন্তু যুগান্তর দলের সদস্য হিসেবে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তিনি ১৯৩১ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেন এবং জেলে থেকেই বাংলা সাহিত্যে এম.এ পাস করেন। জেল থেকে মুক্তিলাভের (১৯৩৮) পর বিক্রমপুরে ফিরে তিনি কৃষক আন্দোলনে যোগ দেন এবং আমৃত্যু বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতা নির্বাচিত হন। সত্যেন সেন ১৯৪৯, ১৯৫৪, ১৯৫৮ ও ১৯৬৫ সালে রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার হয়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করেন।

সত্যেন সেন
১৯৫৪ সালে দৈনিক সংবাদ-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। এ দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে সত্যেন সেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের সংগঠক এবং উদীচী (১৯৬৯) সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত ও গণসঙ্গীতের সুকণ্ঠ গায়ক এবং গণসঙ্গীত রচয়িতা।
সত্যেন সেন সাহিত্যচর্চা শুরু করেন পরিণত বয়সে এবং অতি অল্পসময়ের মধ্যে অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় চল্লিশ। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ: উপন্যাস ভোরের বিহঙ্গী (১৯৫৯), অভিশপ্ত নগরী (১৯৬৭), পদচিহ্ন, (১৯৬৮), পাপের সন্তান (১৯৬৯), কুমারজীব, (১৯৬৯), বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৯৬৯), পুরুষমেধ (১৯৬৯), আলবেরুনী (১৯৬৯), মা (১৯৬৯), অপরাজেয় (১৯৭০), রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ (১৯৭৩); ইতিহাস মহাবিদ্রোহের কাহিনী (১৯৫৮), বাংলাদেশের কৃষকের সংগ্রাম (১৯৭৬), মানবসভ্যতার ঊষালগ্নে (১৯৬৯), ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা (১৯৮৬); শিশুসাহিত্য পাতাবাহার (১৯৬৭), অভিযাত্রী (১৯৬৯); বিজ্ঞান আমাদের এই পৃথিবী (১৯৬৭), এটমের কথা (১৯৬৯); জীবনী মনোরমা মাসীমা (১৯৭০), সীমান্তসূর্য আবদুল গাফফার খান (১৯৭৬) ইত্যাদি।
চিরকুমার সত্যেন সেন বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে প্রগতিশীল ও গণমুখী চেতনা দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে সাহিত্যসাধনা করেন। তাঁর রচনায় ঐতিহ্য, ইতিহাস, দেশের মাটি ও মানুষের শ্রেণী-সংগ্রাম প্রাধান্য পেয়েছে। তিনি উপন্যাসের জন্য ‘বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৭০) লাভ করেন। ১৯৮১ সালের ৫ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনএ তাঁর মৃত্যু হয়। [তপন বাগচী]

রণেশ দাশগুপ্ত

রণেশ দাশগুপ্ত, (১৯১২-১৯৯৭) লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিক। ভারতের আসাম প্রদেশের ডিব্রুগড় শহরে ১৯১২ সালের ১৫ জানুয়ারি তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম অপূর্বরত্ন দাশগুপ্ত ও মাতার নাম ইন্দ্রপ্রভা দেবী। রণেশ দাশগুপ্তের পৈতৃকনিবাস বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার গাউরদিয়া গ্রামে।

রণেশ দাশগুপ্ত
রণেশ দাশগুপ্তের শিক্ষাজীবন শুরু হয় পুরুলিয়ার রামানন্দ পন্ডিতের পাঠশালায়। বাঁকুড়া জেলা স্কুল থেকে তিনি ১৯২৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র রণেশ দাশগুপ্ত ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের কারণে বাঁকুড়া কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন। পরে তিনি কলকাতার সিটি কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকেই তিনি আইএসসি পরীক্ষায় পাস করেন। কলকাতা সিটি কলেজে পুলিশের কড়া নজরদারির কারণে লেখাপড়া ব্যাহত হওয়ায় ভর্তি হন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে। বরিশালে অধ্যয়নকালে কমিউনিষ্ট রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার জন্য তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর এগোয়নি।
রণেশ দাশগুপ্ত সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পত্রিকার সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। কলকাতা সিটি কলেজে পড়ার সময় তিনি অনুশীলন দলের ‘যুগবাণী সাহিত্য চক্রে’ যোগদান করেন। ১৯৩৮ সালে বিপ্লবী নেতা সতীশ পাকড়াশির অনুপ্রেরণায় তিনি সোমেন চন্দ, অচ্যুত গোস্বামী প্রমুখ নেতাদের নিয়ে গড়ে তোলেন প্রগতি লেখক সংঘ। সোমেন চন্দের হত্যার পর সংঘের পাক্ষিক মুখপত্র প্রতিরোধের প্রায় সব সম্পাদকীয় তিনি লেখেন, যদিও তিনি এর সম্পাদক ছিলেন না। পান্ডিত্যের জন্য তিনি সংঘের সদস্যদের শ্রদ্ধা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
১৯৫৮ সালে ঢাকা পৌরসভার নির্বাচনে রণেশ দাশগুপ্ত কমিশনার নির্বাচিত হন। রাজনৈতিক কারণে তিনি প্রায় নয় বছর কারাভোগ করেন। রণেশ দাশগুপ্ত দৈনিক সংবাদসহ দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কাজ করেন। দক্ষ সাংবাদিক হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৭৫ সালের ১লা নভেম্বর একটি সভায় যোগ দিতে তিনি কলকাতায় যান। দেশে সামরিক শাসন ও নানা প্রতিকূলতার কারণে তাঁর আর দেশে ফেরা হয়নি।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করেছেন। প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে আছে উপন্যাসের শিল্পরূপ, শিল্পীর স্বাধীনতার প্রশ্নে, ল্যাটিন আমেরিকার মুক্তিসংগ্রাম, সেদিন সকালে ঢাকায়, রহমানের মা ও অন্যান্য, মুক্তিধারা, সাম্যবাদী উত্থান, সাজজাদ জহির, কখনো চম্পা কখনো অতসী ইত্যাদি। তাছাড়া তিনি বেশ কিছু বই সম্পাদনা করেন।
১৯৯৭ সালের ৪ নভেম্বর কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর লাশ ঢাকায় এনে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পোস্তগোলা শ্মশানে দাহ করা হয়। ১৯৯৮ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়। [মোহাম্মদ কবিরুল হাসান]

শহীদুল্লাহ কায়সার

শহীদুল্লা কায়সার, (১৯২৭-১৯৭১) কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখক। ১৯২৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম আবু নাঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। পিতা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ছিলেন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও লেখক জহির রায়হান তাঁর অনুজ। পান্না কায়সার তাঁর সহধর্মিণী।

শহীদুল্লা কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বিএ (১৯৪৬) পাস করার পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ শ্রেণিতে অধ্যয়ন করেন, কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। ছাত্রজীবনে তিনি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তিনি মূলত সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা করতেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ধারার সকল আন্দোলনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। বামপন্থী রাজনীতির সমর্থক হিসেবে তিনি শ্রমিক-জনতার দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের জন্য সক্রিয় সংগ্রামের ওপর গুরুত্ব দিতেন। ১৯৫১ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন-এ তিনি অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেন এবং ৩জুন গ্রেফতার হয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাভোগ করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি পুনরায় গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ হন। ১৯৫৮ সালের ১৪ অক্টোবর সামরিক শাসক কর্তৃক তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন এবং প্রায় চার বছর কারাভোগের পর ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি লাভ করেন।

১৯৪৯ সালে ঢাকার সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকায় শহীদুল্লার সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫৮ সালে তিনি সংবাদ পত্রিকায় সহযোগী সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন; এখানেই তাঁর সাংবাদিকতা ও সাহিত্যকর্মের গৌরবময় অধ্যায় রচিত হয়।

শহীদুল্লা কায়সারের প্রধান উপন্যাস সারেং বউ (১৯৬২)-এ মানুষ ও তার অস্তিত্বের সংগ্রামের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাঁর কাম্য ছিল সুস্থ ও পরিশীলিত জীবনভিত্তিক একটি উন্নত সমাজ। সংশপ্তক (১৯৬৫), কৃষ্ণচূড়া মেঘ, তিমির বলয়, দিগন্তে ফুলের আগুন, সমুদ্র ও তৃষ্ণা, চন্দ্রভানের কন্যা, কবে পোহাবে বিভাবরী (অসমাপ্ত) তাঁর অন্যান্য উপন্যাস। রাজবন্দীর রোজনামচা (১৯৬২) ও পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ (১৯৬৬) তাঁর স্মৃতিকথা ও ভ্রমণবৃত্তান্ত। সারেং বৌ-এর কাহিনী অবলম্বনে উন্নত মানের একটি চলচ্চিত্র এবং সংশপ্তক অবলম্বনে একটি জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল নির্মিত হয়েছে।

শহীদুল্লা সাহিত্যকর্মের জন্য আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬২) এবং বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২) লাভ করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পূর্ব মুহূর্তে ১৪ ডিসেম্বর রাতে ঢাকার বাসভবন থেকে তিনি অপহূত হন এবং আর ফিরে আসেন নি। [মুহম্মদ শামসুল আলম]

সাংবাদিক বজলুর রহমান ভাইয়া

বজলুর রহমান, (১৯৪১-২০০৮) সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, শিশুসংগঠক, মুক্তিযোদ্ধা। জন্ম ১৯৪১ সালের ৩ আগস্ট ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর থানার চরনিয়ামতপুর গ্রামে। শেরপুর জেলার গণবর্দী স্কুল থেকে ম্যাট্রিক (১৯৫৬), ময়মনসিংহ জেলার আনন্দমোহন কলেজ থেকে আইএ (১৯৫৮), বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে বিএ (১৯৬১) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬২ সালে অর্থনীতিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৬১ বজলুর রহমান দৈনিক সংবাদ-এর সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। ষাটের দশকে তিনি কিছুকাল দৈনিক ইত্তেফাক-এর সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বজলুর রহমান সংস্কৃতি ও রাজনীতি মনস্ক সাংবাদিক ছিলেন। ষাটের দশকে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি এবং ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং স্বক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এ সময় তিনি কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র সাপ্তাহিক একতার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালে বজলুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং কমিউনিস্ট পার্টির বিশেষ মুখপত্র মুক্তিযুদ্ধ পত্রিকার সম্পাদনা করেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি ‘বাংলাদেশ আফ্রো-এশিয়া গণসংহতি পরিষদ’-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অপরদিকে তিনি দৈনিক সংবাদ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের (১৯৭৩-১৯৭৫) দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালে ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ গঠিত হয়। তিনি ছিলেন এ পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি জাতীয় প্রেসক্লাব-এর সিনিয়র সহসভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১৯৮০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত। বজলুর রহমান ‘বাংলাদেশ সোভিয়েত মৈত্রী সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্তএ সংগঠনের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

বজলুর রহমান সংবাদ-জগতের নানা সংগঠন ও সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংস্থা বাংলাদেশ শাখার সভাপতি (১৯৮৪), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার পরিচালনা পরিষদ এবং বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সদস্য নিযুক্ত (১৯৯৭) হন। ১৯৯৮ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেস কাউন্সিলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

বজলুর রহমান শিশু সংগঠন ‘খেলাঘর’-এর সভাপতি ছিলেন। এ সময় তিনি দৈনিক সংবাদ-এর ‘খেলাঘর’ পাতার সম্পাদনা করেন, যাতে লক্ষ করা যায় তাঁর শিশুমনের প্রতি গভীর আগ্রহ। রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় এসে তিনি অর্থনীতি বিষয়ে বিস্তর লেখালেখি করেন। তবে তিনি এসব লেখার গ্রন্থরূপ দিয়েছেন কমই। তাঁর প্রণীত বাংলাদেশের অর্থনীতির হালচাল: ১৯৭৪-১৯৮৭ (২০১০) একটি মূল্যবান গ্রন্থ। এ গ্রন্থে ৩৯টি নিবন্ধ স্থান পেয়েছে, যাতে আলোচিত হয়েছে সমকালীন অর্থনীতির নানা সমস্য। গ্রন্থটিতে যে-সমস্যাগুলি আলোচিত হয়েছে তারমধ্যে প্রধান বিষয় হচ্ছে দারিদ্র্য। তাঁর মতে বাংলাদেশের উন্নয়নে দারিদ্র্যই প্রধান বাধা। তাঁর মতে বিশ্বব্যাংকের করুণা-ঋণ এবং বিদেশের সাহায্য নিয়ে বাংলাদেশের দারিদ্র্য নির্মূল করা সম্ভব নয়। কেননা তাঁর মতে ‘ভিক্ষার অন্নে পেটও ভরে না, মানও বাঁচে না।’ দারিদ্র্য থেকে মুক্তির উপায় সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য: ‘অসম্মানজনক চিরস্থায়ী মিসকিনবৃত্তির বদলে মূলত নিজস্ব সম্পদ ও সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় অগ্রাধিকারকে সামনে রেখে স্বনির্ভর ও সুষম উন্নয়ন প্রক্রিয়ার বুনিয়াদ গড়ে’ তুলতে পারলে, তবেই দেশ দারিদ্র্য মুক্তির দিকে এগোতে পারে। তাঁর মৃত্যু ঢাকায়, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৮। [মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম]

অধ্যাপক পান্না কায়সার

অধ্যাপক পান্না কায়সার বহু সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। জাতীয় সংসদেও প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

শিশু কিশোরদের সংগঠন খেলাঘরের সঙ্গে আজীবন সক্রিয় ছিলেন পান্না কায়সার। ১৯৭৩ সাল থেকে ছিলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য। আর ১৯৯০ সালে এ সংগঠনের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আসেন।

তিনি ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন।

১৯৫০ সালের ২৫ মে পান্না কায়সারের জন্ম। তার পারিবারিক নাম সাইফুন্নাহার চৌধুরী। কলেজে পড়ার সময় ঢাকায় এক উচ্চবিত্ত পরিবারে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শ্বশুরবাড়ির অমানবিক পরিবেশ তার জীবন দুর্বিষহ করে তোলে।

সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে ফের পড়ালেখায় মন দেন পান্না। এইচএসসি পাস করে কুমিল্লা মহিলা কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি নেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন বাংলায় মাস্টার্স করতে।

সে সময়ই পরিচয় হয় তরুণ বুদ্ধিজীবী, লেখক শহীদুল্লা কায়সারের সঙ্গে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল এক দিনে কারফিউয়ের মধ্যে তাদের বিয়ে হয়।

কিন্তু সংসার জীবন দীর্ঘ হয়নি পান্না কায়সারের। বিয়ের মাত্র আড়াই বছরের মাথায় মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে স্বামীকে হারান পান্না কায়সার। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আলবদর বাহিনীর কিছু সদস্য শহীদুল্লা কায়সারকে তার বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। তার আর ফেরা হয়নি।

আরও পড়ুন

না ফেরার দেশে পান্না কায়সার

এরপর থেকে পান্না কায়সার একাই মানুষ করেছেন তার দুই সন্তান শমী কায়সার এবং অমিতাভ কায়সারকে।

অধ্যাপক পান্না কায়সার শিক্ষকতা করেছেন বেগম বদরুন্নেসা কলেজে। তিনি লেখালেখি করে গেছেন দীর্ঘদিন।

তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ: আগে ও পরে; মুক্তি; নীলিমায় নীল; হৃদয়ে বাংলাদেশ; মানুষ; অন্য কোনখানে; তুমি কি কেবলি ছবি; রাসেলের যুদ্ধযাত্রা; দাঁড়িয়ে আছ গানের ওপারে; আমি; না পান্না না চুনি; অন্য রকম ভালোবাসা ও সুখ।

পান্না কায়সার বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় তার ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেব ২০২১ সালে মর্যাদাপূর্ণ বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।