কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের চেতনায় ১৯৫২ সনের ২রা মে প্রতিষ্ঠিত হয়। খেলাঘর জাতীয় দৈনিক সংবাদের শিশু পাতায় আত্মপ্রকাশ করে। তখন সংবাদের শিশু পাতার দায়িত্বে ছিলেন কবি হাবিবুর রহমান। পাকিস্তান সরকারের শাসনআমলে মুক্তচিন্তার শিশু পাতা প্রকাশিত হলে শিশু – কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের মাঝে বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের সৃষ্টি হয়। বাঙালি চেতনায় উজ্জীবীত হয়ে সংবাদের শিশু পাতা খেলাঘরকে কেন্দ্র করে সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় তরুণ লেখকেরা সমবেত হতে থাকে। বাংলাভাষার ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হয় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। হৃদয়ে জেগে ওঠে বাংলাভাষা ও দেশকে ভালবাসার অদম্য স্পৃহা।
বাঙালি জাতিসত্তার জাগরণের বছর বায়ান্ন, ভাষা আন্দোলনের ধারায় বিশেষ করে ভাষা শহীদদের আত্মদানের মাধ্যমে বাঙালী জাতি প্রস্তুত হতে থাকে স্বাধীকার আন্দোলনে। ভাষাকে রক্ষা করতে হলে দেশপ্রেম জাগাতে হবে কোটি বাঙালি প্রানে। এই কাজটি করার জন্য একদিকে যেমন রাজনৈতিক আন্দোলন আর একদিকে শিল্প-সাহিত্য সাংস্কৃতিক জাগরণ। শিশু-কিশোরদের বাঙালি সংস্কৃতির উদারপন্থী ও সৃষ্টিশীল কর্মকান্ডের মাধ্যমে জাগরিত করার জন্য দেশের প্রগতিশীল সূর্যসন্তান শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার, সাংবাদিক সাহিত্যিক সত্যেন সেন, রণেশ দাস গুপ্ত, জহির রায়হান প্রমুখ ব্যাক্তিগণ খেলাঘর গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন সংবাদের খেলাঘর পাতার মাধ্যমে। প্রথমদিকে এর কার্যক্রম শিশু-সাহিত্য সৃষ্টির জন্য সাহিত্যবাসর করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এসকল সাহিত্যবাসরে শিশু – কিশোরদের সৃষ্টিশীল কর্মকান্ডে কিভাবে বেশী বেশী যুক্ত করা যায় তা নিয়েও আলোচনা চলতে থাকে। জেলাগুলো থেকে চিঠি আসতে থাকে খেলাঘরকে সাংগঠনিক রূপ দেয়ার। খেলাঘর আন্দোলনের প্রথম শাখা আসর গড়ে ওঠে বরিশাল শহরে। প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী প্রফেসর কবীর চৌধুরীর পরিবারের উদ্যোগে গড়ে উঠা এই শাখা আসরের নাম ছিল জাগৃহী খেলাঘর আসর।
প্রফেসর ডক্টর কবীর চৌধুরী তখন বরিশাল ব্রজমহন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তিনি আজীবন খেলাঘর আন্দোলনের উপদেষ্টা ছিলেন। এদিকে সময়ের পরিক্রমায় দেশের বিভিন্ন জেলায় শাখা আসর গড়ে উঠতে থাকে। কেন্দ্রীয় সংগঠনের দায়িত্ত¡ গ্রহণ করেন দৈনিক সংবাদের সম্পাদক বজলুর রহমান ভাইয়া। তিনিই মুলত খেলাঘর আন্দোলনকে সাংগঠনিক অবকাঠামোতে প্রতিষ্ঠা করার রূপকার। খেলাঘর পাতায় প্রতি সংখ্যায় ভাইয়ার চিঠি বলে শিশুদের প্রতি একটি চিঠি ছাপা হোত। আনন্দ-ভালবাসা আদরে পরিপূর্ণ এই চিঠি শিশুমনে সাড়া জাগাতো। দলে দলে শিশুরা খেলাঘরের সদস্য হতে লাগল। কেন্দ্র থেকে হলুদ রঙের সভ্যকার্ড পূরন করে লক্ষ লক্ষ শিশু খেলাঘর সদস্য হয়েছে। ১৯৯২ র জাতীয় সম্মেলনে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের হাল ধরেন শহীদ জায়া শিক্ষক প্রাবন্ধিক লেখক অধ্যাপক পান্না কায়সার। ১৯৯২ সালের জাতীয় সম্মেলন উদ্বোধন করেন সাংবাদিক বজলুর রহমান ভাইয়া, প্রধান অতিথি ছিলেন জাতির বিবেক কবি সুফিয়া কামাল। সম্মেলনে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের চেয়ারম্যান অধ্যাপক পান্না কায়সার ও সাধারণ সম্পাদক প্রণয় সাহা নির্বাচিত হন ।