১ম সংখ্যা

খেলাঘর আসর একজন সংগঠকের ভাবনা

হাসান তারেক,সভাপতিমন্ডলীর সদস্য, খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটি

খেলাঘর একটি আন্দোলনের নাম। যার জন্ম হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২মে, মহান ভাষা আন্দোলনের শপথে কবি হাবিবুর রহমান, সাহিত্যিক সাংবাদিক রণেশ দাশ গুপ্ত, সত্যেন সেন, শহীদুল্লাহ কায়সারসহ তরুণ প্রগতি- শীল লেখকদের উদ্যোগে দৈনিক সংবাদে খেলাঘরপাতা আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে। সেই সময়ে খেলাঘরের প্রধান কাজ ছিল সাহিত্যচর্চা এবং খেলাঘরের পাতায় যারা লিখতেন সেই সকল সদস্যদের প্রগতিশীল আদর্শে উদ্বুদ্ধ করা। এভাবে ১৯৫২ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত খেলাঘর ছিল সাহিত্যচর্চাভিত্তিক সংগঠন। ১৯৬৪ সালে বজলুর রহমান খেলাঘরের পরিচালকের (খেলাঘরের ভাইয়া) দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি খেলাঘরকে পাড়াভিত্তিক শিশু সংগঠন বিনির্মানে এগিয়ে নিয়ে যান। অর্থাৎ ‘পাড়ায় পাড়ায় খেলাঘর গড়ে তোলা’ যেটি খেলাঘরের অন্যতম স্লোগান। শিশু-কিশোরদের দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করার আদর্শে অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিকবোধসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলাই ছিল খেলাঘরের মূল লক্ষ্য। তারই ধারাবাহিকতায় খেলাঘর আসরের কলেবর বৃদ্ধিপায়। ঢাকাসহ সারাদেশে খেলাঘর আসরের শাখা গঠিত হয়। সাংগঠনিকভাবে ঘোষণা পত্র, গঠনতন্ত্র তৈরী হয়। পতাকা, প্রতীক ও পোশাক নির্ধারণ করা হয়। সৃষ্টি করা সংগঠনের কাঠামো: জাতীয় সম্মেলন, জাতীয় পরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি, জেলা সম্মেলন, জেলা কমিটি, আঞ্চলিক সম্মেলন, আঞ্চলিক কমিটি, শাখা সম্মেলন, শাখা কমিটি। একটি নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যে থেকে খেলাঘর আসর পরিচালনা করা হয়। যার উদ্দেশ্য হল; শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সুস্থ ও সবল শরীর গঠন ও শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা। সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাসহ সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে প্রতিভার বিকাশ সাধন এবং যুক্তিবাদী, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষার প্রসার। প্রীতি, ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তোলা। শিশুহত্যা, শিশু নির্যাতন, শিশুশ্রম বন্ধ ও শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। মাতৃভূমি ও মাতৃভাষাকে ভালোবাসা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলা। পৃথিবীর সকল শান্তি, স্বাধীনতা ও মুক্তিকামী মানুষের সাথে একাত্ম হওয়া এবং পৃথিবীর সকল মানুষকে ভালোবাসা। আর এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে খেলাঘর আসর শাখা, অঞ্চল, জেলা ও কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসুচি পালন করে।
খেলাঘর আসরের সভ্য হলেন জাতিসংঘের হিসাবমতে শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়সের বাংলাদেশের সকল শিশু। এখন প্রশ্ন হল শিশুরা এখানে সভ্য হবার পর কী করবে? কীভাবে করবে? আমরা যদি খেলাঘরের ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিশ্লেষন করি তাহলে দেখতে পাই প্রথমত শিশুরা আত্মবিকাশে মনোনিবেশ এবং অনুশীলন করবে। একটি শিশুর আত্মবিকাশ বলতে আমরা বুঝি তার পড়াশুনার মানউন্নয়ন, সৎ, নিষ্ঠাবান, বয়োজেষ্ঠ্যদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, পরোপকারী, অসাম্প্রদায়িক, দেশপ্রেমিক, যুক্তিবাদী, একে অপরের মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কুসংস্কারমুক্ত, সৃজনশীল ইত্যাদি গুণাবলীর সমন্বয়। এই আত্মবিকাশের জন্য খেলাঘর আসরের সংগঠকরা সহায়ক শক্তি হিসাবে শিশুদের পাশে দাঁড়াবে এবং তাদের সহযোগিতার মাধ্যমে বিকশিত করবে।

এমনি অবস্থায় আমরা আমাদের খেলাঘরকে গড়ে তুলতে চাই যা হবে আজকের শিশুকিশোরদের আত্মবিকাশের আধুনিক ল্যাবরেটরী। এর জন্য প্রয়োজন খেলাঘরের আদর্শে সৎ, আদর্শবান, ত্যাগী, সৃজনশীল তরুন প্রজন্মের কর্মী এবং পাড়ায় পাড়ায় খেলাঘর আসর গড়ে তোলা। কীভাবে পাবো এই তরুন প্রজন্মকে? একটু চোখকান খোলা রেখে আমরা আমাদের এলাকায় যে সকল সক্রিয়, আধাসক্রিয়, নিষ্ক্রিয় খেলাঘর আসর আছে সেই সকল থানা বা জেলার স্থানীয় কলেজে, বিশ্ববিদ্যা- লয়ে পড়ুয়া প্রগতিশীল ছাত্র/ছাত্রী, পাড়ায় বা এলাকায় পরিচিত সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া, বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং সমাজকল্যান কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের খেলাঘর আন্দোলন সম্পর্কে অবগত করা। তাদের সমাজ সভ্যতার ক্রমবিকাশ, শ্রেণিসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা , শিশুদের অধিকার ও খেলাঘর আন্দোলন বিষয়ে আলোচনা করে জ্ঞানসমৃদ্ধ করা। তাদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন সৃজনশীল (গান, নাটক, আবৃত্তি, শরীরির চর্চা, চিত্রকলা, সাংবাদিকতা ইত্যাদি) বিষয়ে প্রশিক্ষিত করা। অতঃপর শিশুদের বিকশিত করার কাজে জায়গা করে দেওয়া। এই তরুন প্রজন্ম যখন তাদের কাজের মাধ্যমে শিশুদের বিকাশ দেখতে পারবে, সামাজিক দায়বদ্ধতা বুঝতে পারবে তখন সে সংগঠনের নিবেদিত প্রাণ হয়ে উঠবে। তখন সে খেলাঘরের ভাবনায় খেলাঘর গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখবে।

খেলাঘর বরগুনা জেলা কমিটি অকালে শিশু মৃত্যুতে শোক

জানিয়েছে এবং দায়ীদের শাস্তি দাবি করেছে।

 

বাংলা একাডেমী

ফেলোশিপ পেলেন অধ্যাপক পান্না কায়সার

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণায় কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার ২০২১ লাভ করায় বাংলা একাডেমীর নির্বাহী পরিষদ তাকে সম্মানিত করে এই ফেলোশিপ দিল। এই গৌরব অর্জনে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সকল শিশু-কিশোর ভাইবোন ও সারাদেশের সকল পর্যায়ের কর্মী সংগঠকেরা গর্বিত ও আনন্দিত, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় অভিনন্দনসহ ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছে খেলাঘর পরিবার।

পান্না কায়সারের লেখালেখির শুরু ৯০ এর দশকে। ১৯৯১ সালে তার লেখা “মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে” প্রকাশিত হয়। দেশের তরুণ যুবকেরা বইটি পড়ে অনুপ্রাণিত হয়। ফলে অনেক প্রশংসা কুড়ায়। এর পর থেকে তিনি নিয়মিত লিখছেন, পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের অসম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলার জন্য কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের চেয়ারম্যান হিসাবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। শিশু-কিশোরদের দেশপ্রেমিক ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশু-কিশোরদের সংগঠিত করে যাচ্ছেন। তাই তিনি হয়ে উঠেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতীক।

 

এই হোক খেলাঘরের অঙ্গীকার

ধীরেন হালদার, সদস্য, খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটি

প্রকৃতির নিয়মে প্রতিদিন পূর্ব আকাশে সূর্য উদিত হয় আর দিনের শেষে সূর্য অস্তমিত হয়। সূর্য উদিত হলে পৃথিবী আলোকিত হয়, আর অস্তমিত হলে পৃথিবীতে অন্ধকার নেমে আসে। এই পৃথিবীতে মানুষ হচ্ছে শ্রেষ্ঠ জীব। এদের মধ্যে একদল মানুষ সমাজকে আলোকিত করে, আর একদল মানুষ সমাজকে কলুষিত করে। আমাদের দেশেও কিছু মানুষ সমাজকে আলোকিত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। ভেবেছেন শিশু কিশোররাই দেশের আশা এবং জাতির আগামী দিনের কর্ণধার। এদেরকে দেশের যোগ্য ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৫২ সনের ২মে ভাষা আন্দোলনের চেতনায় প্রগতিশীল জাতীয় দৈনিক “সংবাদ” পত্রিকায় শিশুকিশোরদের পাতা “খেলাঘর” প্রকাশ করা শুরু করেন। কবি হাবিবুর রহমান, শহীদ সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সার, সত্যেন সেন, রনেশ দাশগুপ্ত, বজলুর রহমান প্রমুখ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে খেলাঘর-কে সংগঠিত করেন। খেলাঘরই তো শিখিয়েছে- “সৃষ্টিশীল হও, মানুষ হও, মানুষকে ভালোবাসো, ভালোবাসো মাতৃভূমি ও মাতৃভাষাকে।” একথা আজ অকপটে বলতে হয় খেলাঘরই এদেশে অসংখ্য সংস্কৃতিবান দেশপ্রেমিক মানুষ গড়ে তুলছেন। দেশের নানা প্রান্তে খেলাঘরের অসংখ্য শাখা আসরের পতাকাতলে সংগঠিত হয়ে যোগ্য নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। আজ খেলাঘরের কর্মকান্ডকে আরও বেগবান ও গতিশীল করা অত্যন্ত জরুরী কাজ বলে মনে করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি খেলাঘরের মতো শিশু সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করা দেশপ্রেমিক নাগরিকদের একান্ত কর্তব্য। বাংলাদেশকে সুখী সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা শিশু কিশোর সংগঠকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে কর্মসূচীভিত্তিক খেলাঘরের কর্মকান্ড পরিচালনা করতে হবে। তাই খেলাঘরের সংগঠকদের প্রতি উদাত্ত আহবান, আসুন আমরা শিশুকিশোরদের উপযোগী কর্মসূচী নিয়ে গ্রামেগঞ্জে, শহরে বন্দরে ছড়িয়ে পড়ি। এদেশের শিশু কিশোরদের যোগ্য, দেশপ্রেমিক, সংস্কৃতিবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি। চির কিশোর কবি সুকান্তের সুরে সুর মিলিয়ে দৃঢ়ভাবে বলি- “এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি- নব জাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার”।